সম্পাদকীয়

ভারতের আরাধ্য হয়ে উঠছে পাকিস্তান

গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়

ভারতীয়রা বিলেতের যে রাষ্ট্রপ্রধানকে যুদ্ধবাজ বলে ঠাওরেছে এতকাল, সেই উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন, যুদ্ধে একপক্ষ হারে বটে, তবে কোনওপক্ষই জেতে না। যে চার্চিল একদিন বলেছেন, তাঁরা জলে যুদ্ধ করবেন, স্থলে যুদ্ধ করবেন, সর্বত্র যুদ্ধ করবেন, তিনি যখন যুদ্ধের বিরুদ্ধে এই কথা বলেন তখন তা একটু ভাবিয়ে তোলে বইকি। অথচ কিমাশ্চর্যতঃপরম! যে ভারত একদিন অহিংসার বাণী শুনিয়ে সারা বিশ্বকে ভিন্ন দর্শনের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছে সেই ভারত আজ যুদ্ধকে পাখির চোখ করে বসে আছে।

যদি কেউ যুদ্ধের বিরুদ্ধে মনোভাব প্রকাশ করছেন তাঁকে দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া হচ্ছে। আমরা এখন প্রবল জাতীয়তাবোধে আক্রান্ত। অতএব যুদ্ধ, যুদ্ধ, যুদ্ধ চাই। পাক বিরোধী জিগিরে গা না ভাসালে আমাদের বাড়িতে অবরুদ্ধ করে পিটুনি দেওয়া হতে পারে, অথবা সোসাল মিডিয়ায় অশ্রাব্য গালির শিকার হতে হবে। তবু মনে বেশ কিছু প্রশ্ন উঠে পড়ছে। সমস্যা সেখানেই। একরাশ বিপন্নতা মাথায় নিয়েই সেসব প্রশ্ন করতে হচ্ছে।

যুদ্ধ কি কোনওকালে মানুষের শুভবুদ্ধির নির্ণায়ক হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে? সম্রাট অশোক কলিঙ্গ যুদ্ধের পর হত্যালীলার ব্যাপক তা দেখে বিষণ্ণতাবোধে আক্রান্ত হলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন, আর যুদ্ধ নয়। বিশ্বে অন্যতম খ্যাতিমান সম্রাটকেও তাহলে যুদ্ধের অসারতা বুঝতে লক্ষ পুরুষ, নারী শিশু বধের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল? চার্চিল যেমন যুদ্ধের অসারতা বুঝেছিলেন যুদ্ধের পর, সম্রাটের বোধোদয়ও যুদ্ধের পর। অতএব, আমরাও চাইছি, একটা প্রবল যুদ্ধ হোক, পাকিস্তানকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে যদি ভারতের হাজার হাজার যুবক-যুবতীকে প্রাণ দিতে হয়, তাও আচ্ছা। তবু ভারতকে তো জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন পেতে হবে। একটি প্রশ্নের উত্তর বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়ে যায়। একটা যুদ্ধ কি ভারতের আর্থিক অবস্থানকে নতজানু করে দেবে না? একটা যুদ্ধ কি আমজনতার জীবনে অভিশাপ বয়ে আনবে না? একটা প্রতিবেশীর সঙ্গে যুদ্ধ কি অন্য প্রতিবেশীদের ভারতের বিরুদ্ধে একজোট করে দেবে না? ভারত-চিন সম্পর্ক কি ভারত মহাসাগরে কালো মেঘ বয়ে আনবে না? এ সব অপ্রিয় প্রশ্ন অনেকেই যুক্তির সঙ্গে বিশ্লেষণ করতে চাইছেন না। কারণ, আবেগে ভেসে গেলে যুক্তি বোধ আক্রান্ত হয়। পাকিস্তান যেভাবে একদিকে ধর্ম আর অন্যদিকে সেনার মাঝে পড়ে তার অস্তিত্ব খুইয়ে বসেছে, ভারত সেই পাকিস্তানের আদর্শকেই আঁকড়ে ধরতে চাইছে। ভারতও এখন মোদি-শাহের দৌলতে একদিকে ধর্মের অধার্মিকতা অন্যদিকে জেনারেলদের রক্তচক্ষু দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। আর এই অশান্ত আর অনাকাঙ্খিত পরিবেশের মধ্যে ভারতে লোকসভা নির্বাচনের দিন এগিয়ে আসছে। যে ভারত বরাবর গণতন্ত্রের বড়াই করে এসেছে, সেই ভারতের নির্বাচনের দিন এগিয়ে এলে এখন আমরা বলে থাকি ভোটের দামামা বেজে উঠেছে। সাধারণত অতীতে যুদ্ধের আগে দামামা বেজে উঠত। এখন নির্বাচনের আগে তা বাজছে। আর এখন যা শোনা যাচ্ছে তা প্রকৃতই রণবাদ্য। খোদ কেন্দ্রীয় শাসক দল বিজেপি হিন্দুত্বের দামামা বাজিয়ে যেভাবে নির্বাচনে নামতে চলেছে তা গণতান্ত্রিক ভারতের কপালে ভ্রু কুঞ্চন ক্রমেই বাড়িয়ে চলেছে।

গণতান্ত্রিক ভারতে ১৯৫১ সালের নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নেহরু নির্বাচনী জনসভায় গিয়ে বলেছিলেন, সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষাই হবে ভারতের আদর্শ। আজ অনেকেই নেহরুকে যূপকাষ্ঠে চড়াচ্ছেন, কারণ তিনিই নাকি সমস্ত অনিষ্টের মূল। ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ এই ঘটনার উল্লেখ করে একটি অকাট্য যুক্তি দেখিয়ে লিখেছিলেন, নেহরু যদি সেদিন হিন্দুত্ববাদের ধ্বজা তুলে নির্বাচনে নামতেন, তাহলে অনায়াসে অনেক বেশি মানুষের মন জয় করে সিংহাসনে বসতেন, তিনি তা করেননি। তিনি সহিষ্ণুতার কথা বলেছিলেন। এই সহিষ্ণুতার বাতাবরণ ভারত থেকে ক্রমেই উবে যেতে বসেছে। কেন্দ্র যেমন বিজেপি, তেমন এ রাজ্যে তৃণমূল সরকারের বিভিন্ন প্রতিনিধি এবং দলীয় কর্মী একইভাবে পেশি আস্ফালনে দড় হয়ে উঠেছেন। এ রাজ্যেও ভিন্ন মত পোষণ করার পরিবেশ প্রায় নেই। বোঝাই যাচ্ছে আগামী নির্বাচন প্রকৃত রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে পরিণত হতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধ শুধু ভারত সীমান্তে নয়, যুদ্ধ এখন আমাদের বাড়ির উঠোনে এসে পৌঁছেছে। পাকিস্তানে ঠিক এই পরিববেশ চলছে দীর্ঘদিন ধরে। তাদের অগণতান্ত্রিক অত্যাচারী শাসন ক্ষমতা বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের জন্ম দিয়েছে। এখন সে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দারিদ্র আর বেরোজগারি থাবা। ভারতও এবার একই পথের পথিক হতে শপথ নিচ্ছে।   

শত্রু রুপে ভজনা করতে গিয়ে আমরা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে কখন যে আমাদের আরাধ্য করে ফেলেছি, আমরা নিজেরাই জানতে পারিনি।

  • 44
    Shares

One Reply to “ভারতের আরাধ্য হয়ে উঠছে পাকিস্তান

  1. ইতিহাস তার ঘটনাপ্রবাহ কালকে বিধৃত য় করেই এগোয়। এ কথা সত্য সেদিন যদি নেহরু…। গৌতম বাবু রামচন্দ্র গুহর ইতিহাস চেতনাকে উপস্থাপন করেছেন। শেষ করেছেন অত্যন্ত মূল্যবান নিরীক্ষণে। আমরা এক দরিদ্র হিংসা দীর্ণ দেশকে কি অনুসরণ করব না বিশ্বের উন্নত দেশ হব। এ এক বড় প্রশ্ন। যথোপযুক্ত সময়ে যথার্থ প্রশ্ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *