সাহিত্য

ফেব্রুয়ারির গল্প

অরুন্ধতী

দিনটা ছিল ফেব্রুয়ারির চার । সুপ্রীতির বয়স কুড়ি ছুঁইছুঁই । সেদিন সুপ্রীতির বাবা কাজে চিরকালের মতো ইস্তফা দিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন । এসেছিলেন বটে , তবে আগের মতো মা বলে জড়িয়ে ধরেননি সুপ্রীতিকে । দুজনের মধ্যে কোন খুনসুটির অবসর আর আসেনি । বাবা এসেছিলেন কফিনবন্দী হয়ে । সঙ্গে অনেক মেডেল , অনেক সম্মান এসেছিল । বাড়ির উঠোন লোকজনে ভরে গিয়েছিল । বাবাকে সামনে রেখে মুনাফার অঙ্ক কষেছেন নেতা আর সংবাদিকরা । সুপ্রীতির একেবারে একা হয়ে যাবার গল্পটা বেশ লাভজনক হয়তো ! প্রথম আলো দেখার দিনই মা তাকে ছেড়ে চলে গেছেন। পিছুটানহীন এক বিধবা মহিলার কাছে মানুষ। বাবাকে সে পেত কালেভদ্রে । পালিতা মা সুপ্রীতিকে ছোটবেলা থেকে সৈনিকের গল্প শোনাতেন । গল্প শুনতে শুনতে সুপ্রীতির বুক ফুলে উঠত গর্বে । ওর বাবা একজন সীমান্তযোদ্ধা !

বাবার কাছে অনেকবার নির্ঝরের গল্প শুনেছে সুপ্রীতি । বাবা চলে যাবার পর নির্ঝর কয়েকবার এসেছে সুপ্রীতির খবর নিতে । বোঝা যায় , সুপ্রীতির বাবা যেমন স্নেহ করতেন নির্ঝরকে , নির্ঝরও তাঁকে সম্মান করে , ভালবাসে । সদ্য বাবাকে হারিয়ে বাবার ভালবাসার মানুষটির উপর খুব নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল সুপ্রীতি । নির্ঝরও ভরসার হাত বাড়িয়ে দিয়ে আরও কাছে টেনে নিয়েছে সুপ্রীতিকে । একবছর পর ওরা গাঁটছড়া বেঁধে শুরু করে নতুন এক জীবন । একসাথে চলা শুরু হয় যখন , তখনও ছিল ফেব্রুয়ারি । সাত তারিখ ।

সীমান্তযোদ্ধা জীবনসঙ্গী হলে যে কী দুশ্চিন্তায় দিন কাটে ! তারপর ভালবাসা যদি বিপদসীমায় থাকে , তাহলে তো কথাই নেই । সুপ্রীতি এসময় বাবার কথা ভাবে । বাবাও তো সীমান্তযোদ্ধা ছিলেন । দেশের জন্য যে মানুষ মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করেন , তার মেয়ে হয়ে এমন দুর্বলচিত্ত হওয়া মানায় না তাকে। বাবা খুব ভালো আবৃত্তি করতেন , “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য , উচ্চ যেথা শির …”
বাবার উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ আজ সে আরও বেশি করে উপলব্ধি করে । চোখ বন্ধ করে বাবাকে ভাবতে থাকে সে । বাবাই তো তার শক্তি , তার ভরসা, একমাত্র আশ্রয় ।

পরের ফেব্রুয়ারি আবারও এক সুন্দর উপহার দিল সুপ্রীতিকে । ওর কোল আলো করে এলো ওদের আত্মজ । ওরা ভালোবেসে নাম রাখলো , প্রিয়ম । প্রিয়মকে নিয়ে বেশ আছে সুপ্রীতি । নির্ঝরের সাথে কয়েকদিন কথা না হলেও অতটা কষ্ট হয় না । প্রিয়ম ওকে ভুলিয়ে রাখে । ওর হাসির সাথে নির্ঝরেরঅসম্ভব মিল । ওর মুখে নির্ঝরকেই দেখতে পায় সুপ্রীতি । নির্ঝরও প্রিয়মকে না দেখে থাকতেই পারে না । কিন্তু এমন কাজ তার , বেশ কয়েকদিন ফোন ছাড়াই থাকতে হয় তাকে । সু্যোগ পেলেই ভিডিও কল করে চোখ দিয়ে ছুঁয়ে দেখে দুই ভালবাসাকে ।

এই ফেব্রুয়ারি মানে প্রিয়মের একবছরের জন্মদিন । নির্ঝর মাসখানেক আগে থেকেই ছক কষে ফেলেছে । এই ফেব্রুয়ারিতে সে তার ভালবাসাদের সঙ্গে ভালোবেসে থাকবে । তেরো তারিখে প্রিয়মের জন্মদিনটা খুব বড়ো করে সেলিব্রেট করবে । সব আত্মীয়দের সাথে একটা গেট টুগেদার হয়ে যাবে অনেকদিন পর । তাছাড়া বিয়ের পর প্রথম বছর ভ্যালেন্টাইন্স ডে তে সুপ্রীতির সাথে ছিল নির্ঝর । এবার ওকেও একটা সুন্দর মুহূর্ত উপহার দেবে সে । সুপ্রীতিও খুব উচ্ছ্বসিত । কতদিন ধরে কতকিছু একা একাই সামলাতে হয়েছে তাকে । যতই হোক , সীমান্তযোদ্ধা তার বর ! এ যে তার কত অহংকারের ! এর জন্য সব সহ্য করতে পারে সে । তবুও সে খুব আনন্দিত আজ । ওর ভালবাসা ওর কাছে আসছে এতদিন পর ! যার জন্য ওর অন্তহীন প্রতীক্ষা অন্তহীন পথে প্রবহমান অনন্তকাল ।

ফেব্রুয়ারির তেরো তারিখের সকালে পৌঁছতে পারেনি নির্ঝর । চোদ্দ তারিখে ও যখন বাড়ি এলো , ওর কফিনবন্দী প্রাণহীন রক্তাক্ত দেহ শুনতেই পেল না প্রিয়ম আধোআধো স্বরে ওর দিকে হাত বাড়িয়ে ‘বাব্বাব্বাব্বা’ ডেকে উঠল । সুপ্রীতি কষ্ট পেয়েছে । প্রিয় মানুষটিকে হারানোর কষ্টটা ঢেকে রাখা যায় না । প্রিয়ম তার বাবাকে চেনার আগেই বাবা নিরুদ্দেশের পথে হারিয়ে গেল । সে তার বাবাকে ঠিকমতো বাবা বলে ডাকতেই পারল না । না , চোখের জল ফেলে এই আত্মত্যাগকে অসম্মান করার কোন মানেই হয় না । প্রিয়মের সামনে ওর বাবার কাজকে প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব ওরই । সুপ্রীতি চোখের জল মুছে নিল । এখন শুধুই অপেক্ষা । প্রিয়মের বড়ো হবার অপেক্ষা । ওর বাবা তো শুধু ওর বাবা নয় , একজন সীমান্তযোদ্ধা ! আমৃত্যু যে মানুষটা দেশের জন্য লড়াই করে গেল , সে শুধু কারও স্বামী , কারও বাবা হতে পারে না । সে একজন আদর্শ । একশো কোটি প্রিয়মের পথপ্রদর্শক !

  • 11
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *