জেলা পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান

দুর্গাপুরের যৌনপল্লীতে করোনার টিকা নিয়ে ভুয়ো খবরের আতঙ্ক দূরীকরণে ময়দানে নামলেন দুর্গাপুর মহকুমা প্রশাসন।

প্রতিনিধি, দুর্গাপুর

করোনা রোগের মহামারী থেকেও বেশি ছড়িয়ে পড়েছে এঁর নানান ভুয়ো তথ্য যা বর্তমান যুগে নেট দুনিয়ার সৌজন্যে বেগ পেয়েছে আরও বেশি। কখনও নানান রকমের টোটকা দিয়ে দাবী করা হচ্ছে এটি ব্যবহার করলে ধারে কাছে ঘেঁষবে না করোনা। আবার করোনার টিকা নেওয়ার পরেই মানব চুম্বকে পরিণত হচ্ছেন ব্যক্তি। অথচ, বিষয়টির কোনও বৈজ্ঞানিক বা যুক্তিসম্মত ব্যাখ্যা নেই। এমনকি যেখানে দিনরাত এক করে করোনার টিকা তৈরি করেছেন চিকিৎসক বিজ্ঞানীরা, তাদের সেই আবিষ্কারকেও প্রশ্নের মুখে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ভুয়ো ছড়িয়ে পড়া কিছু খবর। স্বাভাবিকভাবে মানুষের মনে আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সমাজের পিছিয়ে পরা মানুষেরা বেশী প্রভাবিত এই ধরেনের ভুয়ো প্রচারে। এদের মধ্যে রয়েছেন নিষিদ্ধপল্লীতে বসবাসকারী যৌন কর্মীরা। একে তো করোনা ও কার্যত লকডাউনের জেরে কাজে ভাটা পড়েছে তাদের, তার ওপর টিকা গ্রহণ করলে যদি সমস্যা বৃদ্ধি পায়! তাহলে কি হবে! এই ভাবনা ঘিরে ধরেছে যৌনকর্মীদের। টিকা নিয়ে এইসব আতঙ্ক থেকে তাদের দূরে রাখতে ময়দানে নামলো খোদ মহকুমা প্রশাসন। দুর্গাপুর কাদারোড নিষিদ্ধপল্লী এলাকায় যৌনকর্মীদের মন থেকে করোনা টিকা সম্পর্কিত ভয় দূর করতে সেখানে স্বশরীরে হাজির হলেন, দুর্গাপুর মহকুমা শাসক শেখর কুমার চৌধুরী। জানা গিয়েছে, যৌন কর্মীদের সুপার স্প্রেডার হিসেবে চিহ্নিত করে প্রথমবার যখন কাদারোড যৌনপল্লীতে টিকাকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, সেইসময় ৮০০ জনের মধ্যে মাত্র ৯০ জন যৌনকর্মী টিকা নিতে সাহস দেখিয়েছিলন। বাকিরা বিরত থাকেন নানান অজুহাত দেখিয়ে। তাই, দ্বিতীয়বার এই মিশন যেন বিফলে না যায়, স্বয়ং মহকুমা শাসক এই ব্যাপারে উদ্যোগী হলেন। মঙ্গলবার দুর্গাপুর মহকুমা শাসক শেখর কুমার চৌধুরী, দুর্গাপুর নগর নিগমের মেয়র দিলীপ অগস্তি ও দুর্গাপুর মহকুমা হাসপাতালের সুপার ডঃ ধীমান মন্ডল সহ প্রশাসনের পদস্থ আধিকারিকরা পৌঁছান কাদারোড এলাকার যৌনপল্লীতে। তারা গিয়ে যৌনকর্মীদের বুঝিয়ে বলেন, টিকার সুফলের কথা। ভ্যাকসিন নিলে সামান্য কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও তা যে ক্ষতিকারক নয়, সেটাই বোঝানো হয় তাদের। প্রশাসন যে তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন তা বোঝা গেল যৌন কর্মীদের আচরণেই। এদিন প্রায় সাড়ে তিনশ জন যৌনকর্মী ভ্যাকসিন নিলেন। দুর্গাপুরের মহকুমা শাসক শেখর কুমার চৌধুরী জানান, ‘টিকা নিতে এখানে অনেকেই ভয় পাচ্ছিলেন, তাদের বুঝিয়ে বলাতে তাঁরা টিকা নিতে সম্মতি জানিয়েছেন’। দুর্গাপুর মহকুমা হাসপাতালের সুপার ডঃ ধীমান মন্ডল জানান, ‘তারা এর আগে টিকাকরণের জন্য ক্যাম্প করেছিলেন যা সেইসময় একপ্রকার ব্যর্থ হয়। এদিন মহকুমা প্রশাসনের তরফ থেকে সকলের বাড়ি বাড়ি গিয়ে করোনা ভ্যাকসিনের গুরুত্ব বোঝানোর পর ভালো সাড়া মিলেছে’। দুর্গাপুর নগর নিগমের মেয়র দিলীপ অগস্তি জানান, ‘ভ্যাকসিন নিয়ে অনেক শিক্ষিত মানুষদের মনেও ভয় আছে, এই এলাকার মানুষদের মনে ভয় থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে, তাদের সঙ্গে কথা বলাতে এই ভয় তারা কাটিয়ে উঠেছে এবং তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে টিকা নেওয়ার দীর্ঘ লাইনে’। টিকা নেওয়ার লাইনে দাঁড়ানো একজন যৌন কর্মী বলেন, ‘আগে তারা টিকা নিতে খুবই ভয় পাচ্ছিলেন, কারণ তাদের সহকর্মীদের মধ্যে অনেকে নেশা করেন, কারও হার্ট সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে। কিন্তু এদিন মহকুমা শাসক ও উপস্থিত অন্যান্য সকলের সঙ্গে কথায় তারা বুঝতে পেরেছেন, করোনা ভ্যাকসিন নেওয়াটা তাদের জন্য কতটা জরুরি’। করোনা আবহে যখন এই মানুষদের কথা একপ্রকার সকলেই ভুলেই যায় সেখানে দুর্গাপুর মহকুমা প্রশাসন ও জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের এই উদ্যোগে সকলেই বেশ খুশি। দুর্বার সমিতির একজন কর্মী জ্যোৎস্না বসু জানান, ‘এই সকল যৌনকর্মীদের মত তারাও ভয় পাচ্ছিলেন। কিন্তু যখন তিনি নিজে ভ্যাকসিন নিয়ে এর সুফল বুঝতে পারলেন, তখন তিনি এবং সমিতির অন্যান্য সদস্যরা সেখানকার মেয়েদের বিষয়টি বুঝিয়ে বলেন। পাশাপাশি এদিন প্রশাসনিক কর্তাদের বিষয়টি বোঝানোতে মেয়েদের মনোবল আরও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা নিজেরাই উৎসাহিত হয়ে টিকা নিতে এগিয়ে এসেছেন’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *